মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০২৪, আষাঢ় ৪ ১৪৩১

নিজেকে হারিয়ে খুঁজি

কামাল কাদের

প্রকাশিত: ১৩:১০, ১১ এপ্রিল ২০২৪

নিজেকে হারিয়ে খুঁজি

ছবি- সংগৃহীত

আসামীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। আসামীর অপরাধ সে তার রক্ষিতা তারক নাথকে খুন করেছে। আসামী নীহারিকা দেবী নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপরাধ সাব্যস্ত করতে চায় ,যদি মহামান্য বিচারপতি এই আদালতে তা সবিস্তারে বর্ণনা করতে অনুমোদন করেন। তার পক্ষে সাহায্য করার মতো পেশাজীবী কোনো উকিল নেই , কারণ এই মামলা চালানোর জন্য যে আর্থিক টাকা পয়সার প্রয়োজন সেটা তার সাধ্যের বাইরে। সুতরাং সে নিজের এই ভয়াবহ পরিস্থিতে জড়িয়ে যাবার পিছনে যে করুন কাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে তা এই সম্মানজনক আদালতকে জানাতে চায়। সব কথা বলার পর আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে যে শাস্তি দিবে তা সে মাথা পেতে গ্রহণ করবে। অবশ্য আদালতের রায়ের উপরে আর কিছু করার থাকবেনা। যদিও উচ্চ আদালতে আপিল করা যেতে পারে , তবে সে দিকটা বিবেচনা করতে গেলে অনেক ব্যায়-সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াবে।

নীহারিকা দেবী মুখ্যু-সুক্ষ মানুষ। সে অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো আদালতের অত সব আইন কানুন বুঝেনা। সে চায় ন্যায্য বিচার। আদালত তার অনুরোধ মনজুর করলেন। । বলা শুরু হলো নীহারিকা দেবীর অতীত জীবনের ইতিহাস।
" আমি নীহারিকা দেবী ,দেবী কথাটা অবশ্য আমার নামে মানায় না। কারণ আমি ধোয়া তুলসী পাতার মতো পবিত্র নই। আমি ঢাকার বাইরে এক মফস্বল শহরে এক বস্তিতে জন্মেছিলাম । আমি জানিনা আমার জন্মদাতা কে ! শুনেছি কোনো এক ধনবান লোকের সুদর্শন ছেলে আমার মার পিছনে ঘোরা- ঘুরি করতো। তারই ওরসজাত সন্তান আমি। পাড়া প্রতিবেশীরা বলে থাকে আমার রূপ এবং সৌন্দর্য আমি নাকি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি। সে আমার মার পেটে আমাকে ঢুকিয়ে পগার পার। তাকে আর কস্মিনকালেও দেখা মেলে নি। তাদের আনন্দের ফসল হলাম আমি। এই পৃথিবীতে আসার আমার নিজের কোনো পছন্দ অথবা হাত ছিলোনা। এই পৃথিবীতে আসার পূর্বে ভগবান যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন তুমি পৃথিবীতে যাবে না আমার কাছেই থাকবে ? তাহলে নির্ধিদ্বায় বলতাম ,আমি আপনার কাছেই থাকবো কি হবে পৃথিবীতে যেয়ে ! আবার তো ফিরে আসতেই হবে। শুধু শুধু পৃথিবীতে যেয়ে হিংসায় মত্ত হয়ে নানা ধরণের অকাজ ,কুকাজ করে লোকের অভিশাপ নিয়ে পাপী হয়ে ফিরে আসার চাইতে, না যাওয়াটাই আমি শ্রেয় মনে করি। কিন্তু আমার বলার কিছুই ছিলোনা।আমি আমার অমতে এই পৃথিবীতে এলাম। মনে হয় আজ আমার পাপের ফলস্বরূপ এখানে এই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। সত্যিকার অর্থে আর দশজন লোকের মতো আমি ও একটা সুন্দর জীবন চেয়েছিলাম ,কিন্তু সমাজ আমাকে সে আশা থেকে পদে পদে বঞ্চিত করেছে। "

কিছুক্ষন নীরবতা থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নীহারিকা দেবী বলে চললো ," মা এবং আমার ঠাকুরমা এই দুজনকে ঘিরেই ছিল আমার জগৎ। পৃথিবীতে আর কাউকে চিনতাম না জানতাম না। ছোটবেলা থেকেই আমার মা অতিরিক্ত দেশীয় মদ্য পান করে বুঁদ হয়ে থাকতো। মদের ভারে আজে বাজে অশ্লীল কথা বার্তা বলে যেত। প্রচুর পরিমানে মদ ভর্তি বোতল আমাদের ঘরে থাকতো। মাকে মদ খেতে দেখে , একদিন আমিও মার অবর্তমানে মদ পান শুরু করে দিলাম। তখন আমার বয়স দশ কিংবা এর কিছু বেশী হতে পারে। প্রথম দিন যখন আমি মদ পান করলাম তখন আমার কাছে মনে হচ্ছিলো আমি যেন এক নুতন জগতে পাখা মেলে দিলাম। নুতন জীবন পেলাম, সেখান থেকে সাময়িক ভাবে রেহাই পেয়ে এক ভিন্ন জগতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। কারণ আমি যে পরিবেশে বেড়ে উঠছিলাম ,সে পরিবেশে আমাদের পরিবারের দুজনই যৌন কর্মী ছিল , যে পেশাটাকে পৃথিবীতে সবচেয়ে পুরানো পেশা বলে থাকে। কিন্তু সে ধারণাটা ক্ষণিকের জন্য থাকতো।মদের নেশা চলে গেলে আবার ফিরে আসতাম অপরাধ জগতে আমার আপন জনের কার্যকলাপে। "

" সব সময়ে নিজেকে একাকিত্ব বোধ করতাম। কেমন যেন মনের ভিতরে একটা ব্যথা অনুভব করতাম। কিন্তু ওই বয়সে এর কোনো সদ উত্তর পেতাম না। ফলে নিজেকে আইনের চোখে ফাঁকি দিয়ে নানা প্রকার অসামাজিক কাজে জড়িয়ে ফেললাম। ছোট খাটো ছেঁচকি চোর হয়ে গেলাম। এই যেমন , রাস্তার দোকান থেকে অথবা ফুটপাথের ফেরিওয়ালার কাছ থেকে নানা রকম দ্রব্য সামগ্রী চুরি করা রীতিমতো অভ্যাসে পরিনিত হয়ে গেলো। সাথে কয়েকজন সাথিও মিলে গেল। ঘর ছেড়ে ওদের সাথে থাকা শুরু করলাম। ওদের প্ররোচনায় এবং ওদেরকে অনুসরণ করে অথবা বেশী টাকা পয়সার লোভে অনেক পথযাত্রীর পকেট কাটার বিদ্যাটাও শিখে ফেললাম। নানা রকম অপরাধ করার ফলে কারাগারে যাওয়া আসাটা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো।একবার ভিতরে যাই ,একবার বাইরে আসি। কখনো ছয় মাস ভিতরে থাকি কখনোবা দুই বছর। কারার প্রহীদের কাছে আমি " গেস্ট কয়েদী " বনে গেলাম। সবাই আমাকে চেনে। এ ভাবেই আমার শৈশব কেটে গেলো। "

" একটা ঘটনা আমাকে আজও জ্বলন্ত ভাবে মনে করিয়ে দেয়, যেদিন আমি প্রথম হিরোইন ড্রাগ পরখ করি। আমাকে আমার এক প্রিয় এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু এই ড্রাগের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই থেকে আমি ড্রাগ এর প্রতি আসক্তি হয়ে পড়লাম। এই খারাপ অভ্যাসের যোগান দিতে আমাকে নানা প্রকারের কূ কার্যে লিপ্ত থাকতে হতো।জেল থেকে বাইরে বেরিয়ে কখনো ড্রাগ কেনার পয়সা না থাকলে দেহ বিক্রি করে তা জোগাড় করা হতো। এমনি করেই এক যুগ ধরে এই ড্রাগের আসক্তি চালিয়ে নিচ্ছিলাম। আগেই বলেছি ঘন ঘন জেলে যাবার ফলে অনেক প্রহরী আমার নাম এবং পরিচয় ভালো ভৱেই জেনে যায়। জেলে যখন যেতাম ,তখন আমার ভালো লাগতো। কারণ বাইরের এ পঙ্কিল জীবন থেকে কিছুক্ষনের জন্য হলেও রেহাই পেতাম এবং নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম এই ভেবে যে, সেখানে আমি অনেক নিরাপদ অবস্থায় থাকতে পারছি।"

" নিজেকে অনেকবার শুধরোবার চেষ্টা করেছি ,কিন্তু প্রতিবারই ব্যাহত হয়েছি। মনে করতাম জীবনে অনেক অন্যায় ,অবিচার দেখেছি এবং সহ্য করেছি ,তারই অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি আমার মতো অবস্থানরত নারীদের বিপথ থেকে সুপথে আনতে পারি তাহলে কেন চেষ্টা করে দেখতে পারিনা ! যতবারই চেষ্টা করেছি ততবারই হেরেছি , সাময়িক উত্তজনায় আবার নিজেকে শংখিল
গতিতে খারাপ কাজে জড়িয়ে ফেলি। "

কিছুক্ষন বিরতী নিয়ে নীহারিকা দেবী আবার বলে চললো ," বড় বড় হোটেলে ক্লাইন্টদের সাথে আমার সময় কাটানো এবং নিয়মিত আসা যাওয়া করাটা একটা অভ্যাসে দাঁড়ালো। একদিন কোনো এক হোটেলে তারক নাথের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হলো। সে আমাকে আশ্বাস দিলো ,আমার এই খারাপ এবং কলুষিত জীবন থেকে আমাকে তুলে নিয়ে সম্মানজনক ভাবে এক সুন্দর সংসার গড়ে তুলবে। তার এই অভিমতে আমি ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখলাম। ঘর বাঁধলাম ঠিকই ,কিন্তু সে আমাকে বিয়ে করতে অপরাগ। তবুও মন কে বুঝালাম এই ভেবে ,একটা আস্তানা তো হলো ! "

" সত্যিকার অর্থে তারক নাথ ছিল মস্ত বড় এক মিথ্যুক ধুরন্দর ব্যবসায়ী এবং তার দূরভসন্ধি যা আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি।তার আসল রূপ ছিল আমাকে রক্ষিতা করে ঢাকা শহরে এক বনেদী এলাকায় রেখে নিজের ব্যবসায়ী কার্যকলাপ চালিয়ে যাবার কৌশল। সে আমাকে প্রয়োজন অনুযায়ী তার ক্লাইন্টদের সাথে সমাজ বহির্ভূত কাজে ব্যবহার করতো। এদিকে সমাজের সবাই জানতো সে ঢাকা শহরে অপর প্রান্তে স্ত্রী ,সন্তানাদী নিয়ে ভদ্রর লোকের মতো ঘর সংসার করছে। আমি যদি তার কোনো আদেশ অমান্য করতাম তাহলে তার নির্দয় এবং কদর্য দমনীয়তার শিকার হতাম। এই ছিল আমার পিছনের জীবনের ইতিহাস। "

যে কারণে আমাকে আজ হত্যাকাণ্ডের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে ,সে দিনের ঘটনাটি আমি এখন এই সম্মানজনক আদালতে খোলাখুলি ভাবে বলতে চেষ্টা করবো। "

আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রায় সময়ই জগড়া ঝাটি লেগে থাকতো। সে অতিরিক্ত রেগে গেলে বন্দুক দিয়ে আমাকে মেরে ফেলবে বলে শাসাতো। আমিও প্রতি উত্তরে রেগে বলতাম , তোকে আমি মেরে নরকে পাঠিয়ে দিব। এভাবেই জীবন চলছিল। ঘটনার দিনটি মেঘলা আকাশ ছিল। বৃষ্টি আসবে বলেও আসছে না।চারিদিক অন্ধকার। সেদিন তারক নাথ তার এক দামী ক্লায়েন্টকে বাসায় নিয়ে আসলো আর আমাকে জানালো তাকে আমোদজনক চিত্ত বিনোদন করতে হবে। তার কাছ থেকে এক বিরাট অঙ্কের " বিজনিস অর্ডার " পাওয়ার আশায় আমাকে এ কাজটা করতে হবে।

আমি জানালাম , আমি কয়েকদিন ধরে অসুস্থ , সুতরাং এ কাজটা আজ আমার দ্বারা হবে না। । সে কিছুতেই আমার অনুরোধ শুনলো না। আমাকে ধাক্কা মেরে লোকটি যে ঘরে অপেক্ষা করছিলো সে ঘরে ঠেলে দিলো। আমি নিরুপায়। সোজা লোকটির সামনে গিয়ে বললাম আমি অসুস্থ ,মানে কয়েকদিন ধরে ঋতুস্রাব হচ্ছে। আমার কথাটি শুনে লোকটি ধড়াস করে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে বাড়ী থেকে বের হয়ে গেলো। আমি স্বস্তি পেলাম। কিন্তু ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়।আমার কার্যকলাপে তারক ভীষণ অসন্তোষ। আমার ব্যবহারে জন্য তারকের আর্থিক দিক থেকে সর্বনাশ হয়ে যাবে সে ছাড়বার পাত্র নয়। সে আমাকে বেদম প্রহার শুরু করে দিল।

এক পর্যাযে আমার শাড়ীর আঁচল দিয়ে গলায় ফাঁস দেয়ার চেষ্টা করলো। আমি নিজেকে ওই হৃদয়হীন ,বদমাইশ থেকে বাঁচার জন্য আমার সামনে এক কাঁচের গ্লাস পেলাম। গ্লাসটিকে ভেঙে ওর পেটের ভিতর ঢুকিয়ে দিলাম। তারপরের ঘটনা আপনারা সবাই পুলিশের কাছে জানতে পেরেছেন।

সেদিন আমার কাছে মনে হয়েছিল ভগবান আছেন , তিনিই আমাকে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ভগবান কখনো আমাদেরকে নিরাশ করেন না। পৃথিবীতে দুঃখ কষ্ট কেউ এড়াতে পারবেনা। তাই আমিও পারি নাই। মহামান্য বিচারপতি ! এখানেই আমি আমার বক্তব্য শেষ করলাম।"

কোর্ট জুড়ে পিন ড্রপ সাইলেন্স। সবাই নিশ্চুপ। বিচারপতি ঘোষণা দিলেন , মামলা পরবর্তী দিনের ঘোষণার জন্য মুলতবি রাখা হলো। সেদিন মামলার বিচার নিস্পত্তি করার জন্য নুতন দিন
ধার্য্য করা হবে।