মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০২৪, আষাঢ় ৪ ১৪৩১

কুঠুরিকান্দির কাক

সৌমেন দেবনাথ

প্রকাশিত: ২০:৫৪, ৩ জুন ২০২৪

কুঠুরিকান্দির কাক

ছবি- সংগৃহীত

বানরের গলায় মুক্তোর মালা মানায় না, কথাটি প্রত্যয়ী জালালকে বলে। জালাল বলে, গুণের কদর জ্ঞানীরাই করে না, তুমি তো রতনপুরের ভূত! ভূত বলতেই প্রত্যয়ী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, বলে, ভূত বলো আমায়? তুমি তো কুঠুরিকান্দির কাক।
কাক ডাক শুনে শুনে জালাল অভ্যস্থ। তাই প্রতিউত্তরে কিছুই বললো না। ছোটোবেলা থেকেই সবাই প্রত্যয়ীকে পরি বলে ডাকে। এমনকি তার স্যারেরাও তার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে মণিদীপা বলে ডাকতেন।

পরেরদিন ক্লিন সেভ করে জালাল বাড়ি এলো। দেখে প্রত্যয়ী বললো, ময়ূরের পুচ্ছ লাগালে কাক কখনো ময়ূর হয় না।
জালাল অবাক হয়ে প্রত্যয়ীকে দেখে, কর্মঠ একজন স্বামীকে সে মূল্যই দেয় না। কর্মঠ স্বামী যে আশীর্বাদ সে জানেই না। নিজেকে সামলে জালাল বলে, আমি কাক, তুমি ফিঙে। কাকের পিছে ফিঙে। কাকের পিছে ফিঙে লেগেই থাকে।
প্রত্যয়ী বলে, মানে? তুমি কাক, কাকের মতো কালো।তুমি অশুভ চিন্তা বাহক, কাক অশুভ বার্তা বাহক।
জালাল এবারও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, কাক কিন্তু ঐক্যের প্রতীক! পরিবেশবান্ধব। আমি যদি কাক হই, চোখ দুটি তো কাকচক্ষু। কাকচক্ষু কি খারাপ?

দিন দশেক পর শ্বশুরবাড়ি গেলো জালাল। শ্বশুরবাড়ির লোক জালালকে খুব সমাদর করেন। মাছ, মাংস রান্না করে খাওয়ান। প্রত্যয়ী খাবার এনে দিয়ে বললো, এই নাও কাক, কাকবলি। পছন্দ তো উচ্ছিষ্টাংশ।
রাগ না করে জালাল খেতে খেতে বলে, শাক-সবজি খেতে বেশি ভালো লাগে।
শুনে প্রত্যয়ী বললো, কাককে যতই মাংস খেতে দেওয়া হোক, সে পঁচা-গলায় খুঁজবে।
একথা শুনে জালাল আর কথা না বলে, খেতে থাকে।
 
দুইদিন থেকে বাড়ির পথ ধরে জালাল, সাথে আসতে চায় না প্রত্যয়ী। বাবা-মা জোর করে পাঠিয়ে দেন। ভ্যানে করে ফিরছিলো, ভ্যানওয়ালার চেহারা নায়ক শাকিব খানের মতো, নাম শাকিব খানই; দেখে মুগ্ধ প্রত্যয়ী। ভ্যানওয়ালা গান ধরলো, কাকের মুখে পাকা আম, নিয়ে ঘোরে গ্রাম গ্রাম।
গান শুনে জালাল ভ্যানওয়ালাকে গরম দিলো। তা দেখে প্রত্যয়ী বললো, চুপ থাকো, ন্যায্য কথার গান, শোনো, না হয় চুপ থাকো।
ভ্যানওয়ালা আবার গান ধরলো, একি বিধির লীলা খেলা, কাকের গলায় তুলসী মালা।
শুনে আবারও জালাল ক্ষেপে গেলো। বললো, তোর এত গুণ, ভ্যান চালাস কেন? তোর এত রূপ, ভ্যান চালাস কেন?
প্রত্যয়ী আবারও স্বামীকে বকলো। জালাল বললো, যাকে কাকের সাথে তুলনা করো তার স্বভাব জানো? কাক তার সঙ্গী মারা গেলে আর দ্বিতীয় সঙ্গী কোনো দিনই বেছে নেয় না।
একথা শুনতেই প্রত্যয়ী রেগে গেলো, আমার মরণ কামনা করো? সরে বসো।
জালাল বললো, কাককে সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়, কিন্তু কাক মানুষের উপকার ছাড়া অপকার করে না।
শুনে প্রত্যয়ী চুপ থাকে, হাসে ভ্যানওয়ালা। আবার গান ধরলো, কাকে করে বাসা, কোকিলে করে বাস।
শুনে প্রত্যয়ী হাসে, ক্ষুব্ধ হয় জালাল। বলে, ভ্যান চালাস, তোর ঘরে কি রূপসী থাকবে? আমি চাকরি করি, তোর মতো ভ্যান চালিয়ে খাই না। সোহেল ভ্যানওয়ালা প্রথম বৌ ছেড়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। যাকে কাক সম্বোধনে গান ধরছিস সেই কাকের স্বভাব জানিস? কাক পরকীয়াবিরোধী পাখি! দ্বিতীয় বার সঙ্গী খোঁজে না।

ভ্যান থেকে নেমে প্রত্যয়ীর হাত ধরে জালাল বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলো। ভ্যানওয়ালা শুনিয়ে শুনিয়ে গানে গানে বললো, কাক কাঁঠাল খায় কোষে কোষে, পরির নাক কাটা যায় আপন দোষে।
শুনে জালালের রাগ হলেও কিছু না বলে চলতে থাকলো। প্রত্যয়ী বললো, তোমার সাথে আমার মানায় না, ভ্যানওয়ালাও বুঝিয়ে দিলো।

বাড়ি ফিরলো জালাল-প্রত্যয়ী। ঘরবাড়ি অগোছালো দেখে প্রত্যয়ীর নিজেরই খারাপ লাগলো। স্বপ্ন ছিলো বড়ো ঘরে বিয়ে হবে, ভাগ্যদোষে বড়ো ঘরে তার বিয়ে হয়নি। বিয়ে হয়েছে কাকের বাসায়। কাকের বাসা আর কত গোছালো হবে! বাড়িতে এসেই গোসল করতে গেলো জালাল। ঘণ্টাখানেক পরে ফিরে এলো। প্রত্যয়ী বললো, পাতিকাকের গোসলপ্রবণতা বেশি। তোমার গোসলপ্রবণতা তাদের গোসলপ্রবণতার চেয়ে কোনো অংশে কম না। কাক যতই গোসল করুক ফরসা হবে?
জালাল কথাতে রাগ না করে বলে, কাকচক্ষু জলে গোসল করতে বড়ো ভালো লাগে।
প্রত্যয়ী বলে, সাত বার করে সিনান, কাক হয় না বকের সমান।
জালাল বলে, মানুষকে কাক বললে মানুষ কখনো কাক হয় না। কালো মানুষকে কালো না বললেই মহৎ হৃদয়ের হওয়া যায়।
প্রত্যয়ী রেগে বলে, তোমার মতো কাক ভূষণ্ডীর মরণ নেই, আমারও মুক্তি নেই।
প্রত্যয়ীর তীর্যক কথা শুনতে শুনতে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে বলে জালাল আর রাগ করে না, কষ্টও পায় না। বললো, আমাকে যে কাক কাক বলো, কাক কিন্তু বুদ্ধিমান প্রাণী।
শুনে প্রত্যয়ী বলে, বাছুর বড়ো বোকা খায় দুধ, কাক বড়ো চালাক খায় মল।
একথা শুনে জালাল আর কথা বললো না।

জালালের হুটহাট ঘুম থেকে উঠা, ভোরে উঠে হাঁটতে যাওয়া আর কাকস্নান প্রত্যয়ীর পছন্দ না। তাই রেগে বলে, কাকের কাকনিদ্রা আর কাকের কাকভোরে উঠা সহ্যাতীত লাগে।
জালাল বলে, স্বামী কালো, তাকে কালোই বলো; কাক বলো কেন?
প্রত্যয়ী বলে, চুপ থাকো, কাকের কা-কাহিনি শুনতে ভালো লাগে না।
জালাল আফসোসের সুরে বলে, হতে পারি কাকের মতো কালো, তবে জেনে রেখো কালো চরিত্রের নই।   তবে কাকের মতো সংঘবদ্ধতায় বিশ্বাসী। কাক যূথবদ্ধভাবে বসবাস করে, ভেদ-বিভেদ চায় না কখনো।

প্রত্যয়ী চলে যায় ঘরে। কাছের বান্ধবী অনামিকাকে ফোন দিলো। প্রায় প্রায়ই তাকে প্রত্যয়ী ফোন দেয়। অনামিকা প্রত্যয়ীর মনোকষ্ট জানে, তাই বলে, বড়ো ভুল করেছেন তোর বাবা। চাকরি করে বলে জালালের মতো কালো ছেলের হাতে তোকে তুলে দিলেন।
প্রত্যয়ী বলে, কাক কালো জলে স্নান করবো, কিন্তু কাক কালো মানুষের জীবনে কেন ডুববো? কালো অশুভ রং, সারাক্ষণ সামনে থাকে। কাকের কা কা ডাক অশুভ বার্তা, তাই শুনে মস্তিষ্ক কতক্ষণ ঠাণ্ডা থাকে? কাক দেখে কাকপ্রীতি জাগে না, জাগে কাকভীতি।
আগুনে ঘি ঢেলে অনামিকা বললো, আমরা কাক দেখলে ভাত ছিটাই, উদার যে। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ কাক দেখলে পিস্তল নিয়ে বের হয়।
প্রত্যয়ী যতটুকু আত্মপ্রত্যয়ী ছিলো অনামিকার কথা শুনে আরও বেশি ভেঙে পড়লো। অনামিকা আবার বললো, কাক কালো, কাকের ডিম সাদা হলেও কাকের বাচ্চা ঠিকই কালো হয়। পণ্ডিতের ছেলে পণ্ডিতও হয়, গাধাও হয়। কালো মানুষের বাচ্চা কালোই হয়, কুৎসিতই হয়।
প্রত্যয়ী বলে, নিয়তি আমাকে নিয়ে এসেছে কাকগৃহে, বাবুই পাখির শিল্পসুষমামণ্ডিত বাসা আমার ভাগ্যে নেই।
অনামিকা বলে, কাকের মুখে সিঁদুরে আম মানায় না। মনোদুঃখে মরেই যাবি।
প্রত্যয়ী বলে, আর বলিস না, যতজন ছেলে আমাকে দেখতে এসেছে সবাই ছিলো কালো। কালো ছেলেগুলোই পড়াশোনা ঠিকমতো করে। পায় চাকরিও। কালোর কপালে ঝোলা ছাড়া উপায়ও ছিলো না। আড়াই কড়ার কাসুন্দি, হাজার কাকের গোল।

পরেরদিন শাকিব খানের ভ্যানে চড়ে শপিং করতে যাচ্ছে জালাল-প্রত্যয়ী। শাকিব খান জালালকে দেখলেই গান ধরে। আজও গান ধরলো, কাকে খায় কাঁঠাল, বকের মুখে আঠা।
জালাল ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তর দিলো, কাক পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত, বক অলস বলে ভ্যানওয়ালা।
ভ্যানওয়ালা শাকিব খান অন্য গান ধরে, কাকের বাসায় কোকিলের ছা, জাতস্বভাবে করে রা।
জালাল বলে, কোকিলের ছা মানুষ চেনে, মানুষের হৃদয় জানে; তাই সে কাকের বাসাতেও আনন্দ পায়।
শাকিব খান দূরে ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে বলে, ঐ যে কাকতাড়ুয়া!
জালাল রেগে বলে, কাকতাড়ুয়া কাকতাড়ুয়ার স্থানে, আমাকে দেখাচ্ছিস কেন? ফসল কি শুধু কাক খায়? ওটা শিয়ালতাড়ুয়া। বল্, ওটা শিয়ালতাড়ুয়া।
জালালের রেগে যাওয়া দেখে শাকিব খান হাসে। আর গানে গানে বলে, ধান খায় কাকে, ব্যাঙের পায়ে দড়ি।
জালাল আরও রেগে গেলো, বললো, কাক-কাঁকুড় জ্ঞান নেই, কাক নিয়ে থাকিস!
প্রত্যয়ী স্বামীর উচ্চবাক্য অতিষ্ঠ হয়ে বললো, কাকের রব শ্রুতিকটু। কাকরুত বাদ দেবে?
জালাল বলে, স্বামীর সম্মানে স্ত্রী সম্মানিত। আমি চোর হলে তুমি চোরের বৌ। আমি ধন্য হলে তুমি ধন্যজনের বৌ। আমার সম্মানহানীতে তুমি উচ্চবাক্য করছো না কেন?
প্রত্যয়ী বললো, তুমি যা তোমাকে তাই বলা হচ্ছে। তুমি মানতে পারছো না কেন?
এ উত্তর শুনে জালাল চুপ হয়ে গেলো। শাকিব খান আবার গান ধরলো, কামরূপেতে কাক মরেছে, কাশীধামে হাহাকার।

ভ্যান থেকে নেমে গেলো জালাল। প্রত্যয়ী নামলো না। জালাল বললো, গাধার পিঠে মানুষ চড়ে। গাধা বহনকারী জীব। শাকিব খানের ভ্যানে আমি চড়ি। সেও বহনকারী জীব। তার অকথ্য কথা আমি শুনবো কেন?
প্রত্যয়ী তবুও ভ্যান থেকে নামলো না। বললো, হেঁটে আসো। আমি বাজার পর্যন্ত ভ্যানেই যাবো। শাকিব খানের গান আমার মনে ধরে।
শাকিব খান দ্রুতই ভ্যান চালাতে লাগলো, আর গান ধরলো, দাঁড়কাকে দাঁড় বায়, পাতিকাকে হুক্কা খায়।
শুনে জালাল বললো, খাস তো ভ্যান চালিয়ে, যাস আমার অফিসে, দেখে আসিস কোথায় বসি, খেয়ে আসিস ঠাণ্ডা বাতাস।
শাকিব খান সে কথাতে কান না দিয়ে গান ধরলো, কাক মরে ঝড়ে, পেঁচা বলে আমার শাপে।

জালাল দ্রুত হেঁটে বাজারে এলো। সুন্দরী বৌ, হারানোর বড্ড হয়। বাজারে এসেই বৌকে পেলো। শাড়ি কিনতে শাড়ির দোকানে গেলো। তিনজন বিক্রেতা শাড়ির দোকানে। একজন একবার প্রত্যয়ীর দিকে আর একবার জালালের দিকে তাকিয়ে প্রথম বিক্রেতাকে বললো, বেল পাকলে কাকের কী? শুনে অভ্যস্থ, দেখ্ আজ কাকের কী!
দ্বিতীয় বিক্রেতা প্রথম বিক্রেতার কথা বুঝতে পারেনি, তাই বললো, কাকের কী? লাভ নেই। নিষ্ফল লোভ।
তৃতীয় বিক্রেতা বুঝতে পেরেছে, তাই প্রথম বিক্রেতাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলো।
প্রত্যয়ী একটি শাড়ি পছন্দ করেছে। প্রথম বিক্রেতা বললো, কালো শাড়িটি নিয়েন না। সাদাটি নিন, সাদা শুভ্রতার প্রতীক,আভিজাত্যের প্রতীক, পরিচ্ছন্নতার প্রতীক, পবিত্রতা ও ত্যাগের প্রতীক।
জালাল বিক্রেতাটির দিকে নিরীহ চোখে তাকায়। সে শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু কেউ উৎকৃষ্ট ভাবে না, ভাবে নিকৃষ্ট।
দ্বিতীয় বিক্রেতা বললো, কালো শাড়িটিই নিন। পরিষ্কার মানুষের কালো রঙে মানায় ভালো।
প্রত্যয়ী বললো, কালোতে যে কী পরিমাণ আমাকে মানায় তা আমি হাড়ে হাড়ে জানি। সাদা শাড়িটি প্যাক করে দিন।

বাড়ি ফিরবে ওরা, এবার ফল কিনবে বলে জালাল বারবার প্রত্যয়ীকে বলছে। প্রত্যয়ী আপেল, কমলা, মাল্টা না আঙুর খাবে জানতে চাচ্ছে। বিরক্ত প্রকাশ করে প্রত্যয়ী বললো, কাকফল খাবো।
জালাল বিস্ময় প্রকাশ করে বললো, কাকফল!
প্রত্যয়ী বিরক্তস্বরের মাত্রা বাড়িয়ে বললো, কাকের প্রিয় ফল নিমফল। নিমফলের আর এক নাম তাই কাকফল।
থমকে গেলো জালাল। ফল না কিনেই বৌর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। ভ্যানস্ট্যান্ডে আসতেই শাকিব খান বললো, ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না যেমন তেমন পয়সা দেখলে রূপসীর অভাব হয় না। পয়সার লোভে রূপসীদের মুখ হা।
প্রত্যয়ী এবার কথাটি ধরলো, সাদা চামড়া বেশিদিন সাদা থাকবে না, রোদে ভ্যান টানলে। বাইরটা কালো মানা যায়, ভেতরটা কালো মানা যায় না।

অন্য ভ্যানে উঠলো ওরা। সেই ভ্যানে বসেই প্রত্যয়ী বললো, আমার স্বামীকে কাক বলি আমি, সেটা হয় ভালোবেসে না হয় রেগে। তুই কাক বলার কে! তুই মানুষ হয়ে মানুষের পিছে লাগিস, কাক কখনো কাকের পিছে লাগে না। কাক কখনো কাকের মাংস খায় না। কাকের স্বভাবের চেয়ে জঘন্য তোর স্বভাব।
শাকিব খান প্রত্যয়ীর প্রতিবাদী রূপ দেখে উত্তর করার ভাষা হারিয়ে ফেললো। জালাল-প্রত্যয়ী চলে গেলে শাকিব খান গান ধরলো, ময়না-টিয়ে উড়িয়ে দিয়ে খাঁচায় পোষে কাক।

বাড়ি এলো প্রত্যয়ী-জালাল। জালাল বারবার দেখছে প্রত্যয়ীকে। প্রত্যয়ীকে আজ যত না সুন্দর লাগছে তারচেয়ে বেশি মায়াবী লাগছে। জালাল বললো, আমি জানি, তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো, নতুবা আমার সাথে থাকতে না। আমার সাথে থেকে থেকে বুঝে গিয়েছো কালো মানুষটার হৃদয় কালো নয়।
প্রত্যয়ী বললো, রোজগার জানো বলে সুন্দরী বিয়ে করা ঠিক না। রঙের সাথে বসবাসের ব্যাপার আছে, জাগ্রত বিবেক মানতে চাইলেও বাস্তবতার কারণে মানা যায় না। আবার রোজগারওয়ালার সাথে রোজগারওয়ালাকে মানায়, রোজগার জানা মানুষের গুণ আর সুন্দরীর গুণ কখনোই এক না। সুন্দরী বলে কত অহংকার আমার, অথচ রোজগার জানো তুমি, অহংকার তোমাকেই মানায়। সমাজ তোমাকে আমাকে দেখে আমার দুর্ভাগ্য পরিমাপ করে। অথচ তোমার দুর্ভাগ্য পরিমাপ করে না, তোমার গুণের কাছে আমি নেহাত আর নগণ্য। আমার সাংসারিক জ্ঞানটুকুও নেই, অথচ তুমি কিছুই বলো না। আর তুমি দেখতে কালো বলে তোমাকে কতভাবেই ছোটো করি, অথচ তোমার কর্মগুণের কাছে আমি কিছুই নই। সমাজ দেখে আমার বরভাগ্য মন্দ, সমাজ দেখে না আমি বরের যোগ্য নই। দেহটা কাকের মতো কালো হতে পারে তোমার, মনটা কাকের দেহের চেয়ে কালো আমার।
জালাল প্রত্যয়ীর দুই কাঁধে দুই হাত রাখে আর বলে, আমি যে কালো শুনতে শুনতে আমি মনে মনে মরেই গিয়েছি। সংসারে, কর্মক্ষেত্রে কোথাও মাথা উঁচু করে রাখতে পারি না কালো বলে।
প্রত্যয়ী জালালের বুকে মাথা রেখে বলে, কেউ যদি আর কালো বলে তোমায় কঠিন প্রতিবাদ যাবে আমার থেকে।
জালাল বলে, কাক আমি, কিন্তু তীর্থের কাক। তোমাকে পাবোই এই আশায় অপেক্ষা আমার ছিলোই।

বাইরে দিয়ে শাকিব খান গান গাইতে গাইতে চলে যাচ্ছে, জানো কি তোমরা ও ভাই, পাকা আম দাঁড়কাকে খায়।

জানালা খুলে প্রত্যয়ী খুব বিশ্রী একটা গালি দিলো শাকিব খানকে আর বললো, কুঠুরিকান্দির কাক শাকিব খানই।
শাকিব খানের প্রতি প্রত্যয়ীর আগের সেই মুগ্ধতা আর নেই। সে বুঝে গিয়েছে মন সুন্দর মানুষই সুন্দর মানুষ।