সোমবার ১৫ এপ্রিল ২০২৪, বৈশাখ ১ ১৪৩১

পীরগাছা রাবার বাগানে এক বিকেল

ইকবাল কবীর রনজু

প্রকাশিত: ১০:০১, ৩ অক্টোবর ২০২২

আপডেট: ১০:০৩, ৩ অক্টোবর ২০২২

পীরগাছা রাবার বাগানে এক বিকেল

ছবি:সংগৃহীত

ধারালো ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খেজুর গাছ কেটে মিষ্টি রস বের করতে এবং তা থেকে গুড় তৈরী করতে দেখেছি অনেক বার কিন্তু তাজা রাবার গাছ কেটে কষ বের করে তা থেকে কিভাবে রাবার তৈরী করা হয় এটা জানার আগ্রহ ছিল অনেক দিন থেকেই। অনেক দিন ভেবেছি রাবার বাগান দেখতে যাব, সময়, সুযোগ কোনটাই হয়ে উঠছিলনা। গত ২২ সেপ্টেম্বর সেই সুযোগ হয়। তীব্র আকর্ষণ থেকে দেখতে যাই বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের পীরগাছা রাবার বাগানটি। ১৯৮৬ সালে তিন হাজার একর জায়গার উপর গড়ে তোলা হয় এ রাবার বাগান।

পাবনা থেকে ময়মনসিংহ রুটে প্রায়শই যতায়াত করতে হয় আমাকে।টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে ময়মনসিংহের দিকে একটু এগুলেই হাতের বাম দিকে একটি শাখা রাস্তা চলে গেছে পীরগাছা রাবার বাগানের দিকে। সেদিন হাতে তিন চার ঘন্টা সময় থাকায় ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে নেমে পড়ি আনারসের শহর মধুপুরে। ঘড়ির কাটা তখন বিকেল তিনটা ছুঁই ছুঁই করছে। জামালপুর রোডের হোটেল আপ্যায়নে ৫০ টাকার ভর্তার প্যাকেজ (তিল, তিশি, শুটকি মাছ, আলু ও ডিম ভর্তা) ও পাতলা ডাল সহযোগে ভাত খেয়ে রওনা হই পীরগাছা রাবার বাগানের উদ্দেশে।

পথ ঘাট চেনা না থাকায় দু চারজন লোককে জিজ্ঞেস করে জেনে নেই কিভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব। মধুপুর বাসস্ট্যান্ড মোড়ের মসজিদের পাশ থেকে অটোরিকশায় যাওয়া যায় পীরগাছা রাবার বাগানে। মোটর সাইকেলেও যাওয়া যায়। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে পীরগাছা রাবার বাগান দেখতে আসতে চাইলে তাকে বাসে চড়ে প্রথমে আসতে হবে মধুপুর। দূরত্ব ভেদে ভাড়ার তারতম্য ঘটবে। অটো রিজার্ভ করলে রাবার বাগান যেতে প্রায় তিনশ টাকা চাইবে অটো চালকরা। মোটর সাইকেলে পুরো বাগান ঘুরে দেখতে চাইলে জন প্রতি খরচ পরবে ছয়’শ থেকে সাত’শ টাকা। ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার মাইক্রোবাস নিয়ে অনায়াসে যাওয়া সম্ভব। টাকা সাশ্রয়ের জন্য মোটরসাইকেল বা অটো রিজার্ভ করা বাদ দিয়ে অটোবাইকে উঠি। আমার আগে বিশ-একুশ বছরের এক তরুণী যাত্রী উঠেছিলেন এ অটো বাইকে। তিনিও রাবার বাগানে যাবেন। সেই সময়ে সরাসরি রাবার বাগানে যাবার অটোবাইক না পাওয়ায় পিরোজপুর এলাকায় পৌছার জন্য আমাদের এ অটো বাইকে চড়া। তরুনীটি অপরিচিত হওয়ায় তার সাথে কোন কথা হয় না আমার। পাকা হলেও ভেঙ্গেচুড়ে যাওয়া এবরো থেবরো রাস্তায় পিরোজপুর পৌঁছাতে সময় লাগে বিশ মিনিটের মতো। পিরোজপুর নেমে ১৫ টাকা ভাড়া চুকিয়ে দেই। পিরোজপুর পৌঁছে অটো বদলাতে হয় আমাকে। রাবার বাগান সম্পর্কে অটো চালককে দু একটি প্রশ্ন করায় এবং আমি রাবার বাগান দেখতে যা”িছ শুনে মেয়েটি জানায়,আমি রাবার বাগানের মেয়ে, আপনি আমার সাথে যেতে পারেন। আমি সম্মতি জানালে মেয়েটি আরেকটি অটো ভাড়া করে। যাত্রী আমরা দুজনই।

পিরোজপুর থেকে রাবার বাগানের দিকে যাওয়ার রাস্তাটি সরু হলেও অনেকটাই মসৃন। এ রাস্তায় যাওয়ার পথে চোখে পরে সারি সারি অনারস, কলা ও পেঁপে বাগান। মাঝে মধ্যে সবুজ ধান খেত। এ এলাকার প্রধান ফসল সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়েটি জানায়, অনারস ও কলা এ এলাকার প্রধান ফসল। রাবার বাগানের গল্প শুনতে শুনতে মিনিট বিশেক এর মধ্যে পৌঁছে যাই পীরগাছা গরম বাজার। অটোবাইক থেকে নামতেই হালকা বৃষ্টি শুরু হয়। রাবার বাগান ঘুড়ে দেখতে পারব কি না এ সংশয় ভীড় জমায় মনে। পনেরো টাকা ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে অটো থেকে নেমে একটি চায়ের দোকানে উঠি। সকাল থেকে চা খাওয়া হয়নি আমার।চায়ের চুলো থেকে তখন আগুনের বদলে ধুয়া বেরুচ্ছে। চা খেতে চাইলে দোকানী দ্রুত আগুন জ্বালিয়ে আমাকে চা খাওয়ান। মেয়েটি চলে গেছে ততক্ষণে। টাঙ্গাইলের কোথায় যেন অনার্স পড়ছে এটুকু ছাড়া ওর নাম পরিচয় কিছুই জানা হয়নি।

কয়েক মিনিট পরেই হালকা বৃষ্টি ছেড়ে যায়। রাবার বাগানের অফিসে যাব বলে এবার বিশ টাকায় একটি ভ্যান ভাড়া করি আমি। লাল মাটির রাস্তায় মিনিট চারেকের মতো যাওয়ার পরই চোখে পরে সুবিশাল রাবার বাগান। এ যেন অকৃত্তিম সৈন্দর্যের ধারক। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দেখার উপায় নেই। যত দূর চোখ যায় কেবল সবুজ আর সবুজ। প্রায় প্রতিটা গাছের নিম্নাংশ ক্ষত বিক্ষত। বুকে বহন করছে অস্ত্রাঘাত,কাটা চেড়ার দাগ। সকালে কষ সংগ্রহ করলেও পরন্ত বিকেলে কোন কোন গাছে নাল বেয়ে ফোটায় ফোটায় ঝড়ছে দুগ্ধ ধবল রাবার কষ। কোন কোন গাছের কাটা অংশ শুকনো। কোনটার গা বেয়ে মাটিতে পরছে রাবার কষ।এসব দেখতে দেখতে কাচা প্রশস্ত রাস্তায় ছুটছি আমি। বামে মোড় নেয় আমাকে বহন করা ভ্যান গাড়িটি। রাবার বাগানের মধ্যে চোখে পরে এক সুবিশাল খেলার মাঠ। ততক্ষণে আবার রোদ বেড়িয়েছে। উঁচু উঁচু রাবার গাছের কাচা সবুজ রঙের পাতার ভেতর দিয়ে উঁকি মারছে বিকেলের সোনালী রোদ। এ এক অন্য রকম অনুভূতি। শীতল ছায়ায় মূহুর্তে দূর হয়ে যায় ভ্রমণের ক্লান্তি। রাবার বাগানের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আনসার ক্যাম্প পেড়িয়ে আরেকটু অগ্রসর হলেই হাতের বামে রাবার বাগানের অফিস। বিকেলের অবসর সময়ে আয়েশ করে আরাম করছিলেন সিকিউরিটি গার্ড আবুল কালাম আজাদ। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান তিনি। ক্ষণকালের আলাপেই বুঝতে পারি খুবই বন্ধুবৎসল মানুষ তিনি। সামনে তাকাতেই চোখে পরে রোদে শুকাতে দেওয়া শত শত পাতলা সাদা রাবার শীট। রাবার তৈরীর প্রক্রিয়া জানতে বুঝতে আমাকে সাহায্য করতে আমার সাথে এগিয়ে চলেন আবুল কালাম আজাদও। ছবি ওঠার লোভ সংবরণ করতে পারি না। তার হাতে ক্যামেরা দিতেই তিনি সহাস্যে কয়েকটি ছবি তুলে দেন।আরেকটু এগুলেই চোখে পরে বড় বড় বাক্স আকৃতির পাত্র। সংগ্রহের পর প্রক্রিয়াজাত করার জন্য এগুলোতেই রাখা হয় রাবার কষ। পানি ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিষের মিশ্রণ করে কষ জমে যাওয়ার অপেক্ষায় রাখা হয় এ পাত্রে। জমে যাওয়ার পূর্বেই এক ইঞ্চি পরিমান পর পর নির্ধারিত যায়গায় বড় বড় প্লেট স্হাপন করা হয়। এর পর পুরো জমে যাওয়ার অপেক্ষায় রেখে দেওয়া হয় রাবার কষ। জমে গেলে তুলে ফেলা হয় প্লেট গুলো। খন্ড খন্ড রাবার শিট উঠিয়ে নিয়ে কাটারের সাহায্যে কেটে চারভাগ করা হয়। এর মধ্যে থেকে যাওয়া জলীয় অংশ বের করার জন্য চাপ দেওয়া হয় মেশিনে। তার পর শুকোনো হয় রোদে। শুকানোর পর ধুম ঘরে ধোয়ার মধ্যে রাখা হয় প্রায় ৭২ ঘন্টা। লালচে ভাব না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই রাখা হয় রাবার শীট গুলো। রাবার বাগানের পদ¯’ কিছু লোক আসায় তাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন আবুল কালাম আজাদ। আমি সেখানে আরো কিছু সময় কাটিয়ে ফের রাবার বাগানের রাস্তায় হাঁটতে থাকি। প্রায় দেড় লক্ষাধিক গাছের সবুজের মনোমুগ্ধকর সমাহার। পরম মমতায় হাত বুলাই রাবার গাছের গায়ে। একা ইতিমধ্যে বাগানের বেশ খানিকটা ভিতরে চলে এসেছি আমি। এক এক ঋতুতে নাকি এক এক রূপ ধারণ করে এ রাবার বাগান। একটু পরেই সন্ধ্যা হবে তাই ফেরার চিন্তা মাথায় আসতেই আর অগ্রসর না হয়ে পিছু ফিরি আমি। রাবার বাগানের মাঠে ফুটবল খেলছিল একদল ছেলে। হয়তো ছন্দ পতন ঘটাতে মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। দ্রুত পা চালাতে থাকি। বাগানের প্রবেশ পথের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি আমি। এসময় কারো ডাক কানে আসে। এখানে চেনা জানা কেউ নেই আমার।ফিরে তাকাতেই চোখে পরে আমার অটোবাইকের সহযাত্রী মেয়েটিকে।এগিয়ে যাই আমি।বৃষ্টির ছোট ছোট ফোটা পরছে। মেয়েটা বলে, “আমি তানিয়া তালুকদার। এটাই আমাদের বাড়ি। বলছিলাম না-আমি রাবার বাগানের মেয়ে।” রাবার বাগানের তারকাটা সংলগ্ন ছোট ছিম ছাম টিনের তৈরী বাড়ি। বাড়ির সামনের অংশে তানিয়ার রাবার শ্রমিক বাবা বছির তালুকদারের দোকান। রাবার বাগানে কাজের অবসরে অতিরিক্ত আয়ের জন্য এ দোকান চালান তিনি। দোকানের সামনের উঠানে জ¦লছে চায়ের চুলা।

তানিয়ার মায়ের সাথে কুশল বিনিময় হয় আমার। জানতে পারি টাঙ্গাইেেলর মৌলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে ম্যানেজমেন্টে অনার্স করছে তানিয়া। আমাকে চা বিস্কুট খাওয়ান তানিয়ার মা। অনুমান করি, তালুকদারী হয়তো নেই কিš‘ মনের আভিজাত্যে আমার সন্তান তূল্য তানিয়া ও ওর মা কিছুতেই কম যান না। চা পান করে আমি যখন ওদের বাড়ি থেকে উঠি তখন ঊষা লগ্ন ছুঁই ছুঁই।মেঘ ও সূর্যের রক্তিম লাল আভা তখন মিলে মিশে একাকার। সে এক ভৌতিক দৃশ্য। এক মিনিটের হাটা পথে চলে আসি রাবার বাগানের গেটে। আরেকবার পিছু ফিরে তাকাতেই চোখে পরে মোহনীয় দৃশ্য।রাবার বাগানে গরু চরিয়ে রাখালেরা গরুর পাল নিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছেন যার যার বাড়িতে। বজ্রের শব্দ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আরোকয়েকটি ছবি ক্যামেরাবন্দী করি। এক মূহুর্ত দেরি না করে ফিরে আসি পীরগাছা গরম বাজারে। সেখান থেকে ফের অটোতে মধুপুর। অত:পর যাত্রা করি ময়মনসিংহের উদ্দেশে।

 

ইকবাল কবীর রনজু, সহকারি অধ্যাপক-মির্জাপুর ডিগ্রী কলেজ